:

মূল্যস্ফীতির কবলে পিষ্ট জনজীবন—মৌলিক চাহিদাই এখন বিলাসিতা!

top-news

রাজধানীর মৌচাক মোড়। একদিকে তীব্র গতির বিলাসবহুল পাজেরো, অন্যদিকে ৭৫ বছর বয়সী রহমত উল্লাহর হাড়-জিরজিরে শরীর নিয়ে প্যাডেল চালিত রিকশার মন্থর চাকা। রহমত উল্লাহ একটি ভ্রাম্যমাণ দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে ১০ টাকার একটি শুকনো পরোটা কিনলেন। এর অর্ধেকটা এখন খাবেন, বাকি অর্ধেকটা গামছায় বেঁধে রাখলেন বিকেলের জন্য।

উন্নয়ন আর জিডিপির ঝকঝকে পরিসংখ্যানের আড়ালে রহমত উল্লাহদের এই ‘অর্ধেক পরোটার’ দীর্ঘশ্বাসই আজ বাংলাদেশের অর্থনীতির রূঢ় বাস্তবতা।

দেশের শীর্ষস্থানীয় গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডি (CPD) এবং সানেম (SANEM)-এর সাম্প্রতিক প্রতিবেদনগুলোতে দেখা গেছে, বাংলাদেশে খাদ্য মূল্যস্ফীতি এখন দুই অঙ্কের ঘর স্পর্শ করেছে। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য এটি ২৫%-এরও বেশি।

গত এক বছরে চালের দাম ১০-১৫%, ডাল ২০% এবং সয়াবিন তেলের দাম দফায় দফায় বেড়েছে। মাছ-মাংস তো দূরের কথা, সাধারণ শাক-সবজি কেনাই এখন সাধারণ মানুষের সাধ্যের বাইরে। গবেষণা বলছে, পুষ্টির চাহিদাও এখন কাটছাঁট করছে শ্রমজীবী মানুষ।

বিশ্ববাজারের অস্থিরতা এবং দেশীয় নীতিমালার কারণে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি হয়েছে এই সংকটের অন্যতম ‘অনুঘটক’। ডিজেলের দাম বাড়ার ফলে ট্রাক ভাড়া ও গণপরিবহন ভাড়া এক লাফে ৩০-৪০% বেড়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে কৃষিপণ্যের দামে।

 বিদ্যুতের অসহনীয় লোডশেডিং এবং গ্যাসের অভাবে শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। বড় বড় শিল্পগোষ্ঠী তাদের পূর্ণ সক্ষমতায় কাজ করতে পারছে না, যার প্রভাব পড়ছে পণ্যের সরবরাহ চেইন এবং বাজারে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাব এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ডলার সংকটের কারণে আমদানিকারকরা প্রয়োজনীয় এলসি (LC) খুলতে হিমশিম খাচ্ছেন। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ (FDI) প্রায় স্থবির। ডলারের বিপরীতে টাকার মানে ঐতিহাসিক পতন ঘটায় বিদেশি বিনিয়োগকারীরা নতুন করে পুঁজি খাটাতে ভয় পাচ্ছেন।

বিনিয়োগ না থাকায় নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে না। ফলে শিক্ষিত তরুণ থেকে শুরু করে অদক্ষ শ্রমিক—সবার মধ্যেই বাড়ছে হাহাকার।

বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বারবার উঠে আসছে যে, মুষ্টিমেয় কিছু বড় আমদানিকারক ও মিল মালিক বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে।
সরকার নির্ধারিত দামে বাজারে পণ্য পাওয়া যায় না। কৃত্রিম সংকট তৈরি করে কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে অসাধু সিন্ডিকেট। মাঠ পর্যায়ে বাজার তদারকি সংস্থাগুলোর অভিযান চললেও তার প্রভাব ভোক্তাদের পকেটে পৌঁছাচ্ছে না।

দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনেও এই অর্থনৈতিক সংকট প্রধান আলোচনার বিষয়। সমাজবিজ্ঞানীরা আশঙ্কা করছেন যে, দীর্ঘস্থায়ী এই আর্থিক অনটন সমাজে অপরাধ প্রবণতা এবং পারিবারিক সহিংসতা বাড়িয়ে দিচ্ছে। মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো এখন ‘নীরব হাহাকারে’ দিন কাটাচ্ছে। তারা না পারছেন টিসিবির ট্রাকের পেছনে দাঁড়াতে, না পারছেন কারও কাছে হাত পাততে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, কেবল টিসিবির ট্রাক বাড়িয়ে এই সংকট সমাধান সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন: সুদের হারের সঠিক সমন্বয়: মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে মুদ্রানীতির কঠোর প্রয়োগ। বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ: রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও ব্যবসার অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করা। কঠোর বাজার মনিটরিং: রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়ে সিন্ডিকেট ভাঙা।

রহমত উল্লাহ যখন আবার রিকশার প্যাডেলে চাপ দেন, তখন তার চোখ ঝাপসা হয়ে আসে। তার মতো লাখো মানুষের জীবন আজ কেবল টিকে থাকার লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ।

অর্থনীতির চাকা যদি কেবল ধনীদের স্বার্থে ঘোরে, তবে রহমত উল্লাহদের সেই দীর্ঘশ্বাস একদিন সামষ্টিক অর্থনীতির জন্য বড় বোঝা হয়ে দাঁড়াতে পারে।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *